ক্রীড়া রিপোর্ট : দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের পর চমৎকার বোলিং। বল-ব্যাটে কড়া দাপট। ২২ গজে চড়া হাসি। এ যেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতিচ্ছ্ববি।
এশিয়া কাপে যেখানে শেষ করেছিল বাংলাদেশ, ঠিক সেখান থেকে শুরু। ঘরের মাঠে আট মাস পর মাঠে নামল বাংলাদেশ। তাইতো মিরপুরে উপস্থিত প্রায় ১৮ হাজার দর্শক। উপস্থিত দর্শকদের হতাশ করেননি মাশরাফিরা। জয় নিয়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ শুরু করল বাংলাদেশ। ইমরুল, নাজমুল, সাইফউদ্দিন ও মিরাজদের দাপটে স্রেফ উড়ে গেছে জিম্বাবুয়ে।
আগে ব্যাটিং করে ৮ উইকেটে বাংলাদেশ তুলেছে ২৭১ রান। জবাবে জিম্বাবুয়ে ৯ উইকেটে ২৪৩ রানের বেশি করতে পারেনি। বাংলাদেশ ম্যাচ জিতেছে ২৮ রানে।
সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন ইমরুল কায়েস। তার ঝড়ো ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ পায় কাঙ্খিত পুঁজি। হাফ সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। দুজনের ১২৭ রানের জুটিতে বাংলাদেশ পায় লড়াকু সংগ্রহ। সেই রান তাড়া করতে পারেনি জিম্বাবুয়ে। বোলিংয়ে নাজমুল, মিরাজদের দাপটে লক্ষ্য আকাশচুম্বি হয়ে যায় সফরকারীদের জন্য।
ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের ইনিংসকে ভাগ করতে হবে তিনভাগে। প্রথমে টস জিতে ব্যাটিং করতে নেমে ১৭ রান তুলতেই ২ উইকেট হারায় স্বাগতিকরা। লিটন দুবার জীবন পেয়ে করেন মাত্র ৪ রান। অভিষিক্ত ফজলে রাব্বী খুলতে পারেননি রানের খাতা। দুজনকেই ফেরান পেসার চাতারা।
এরপর মুশফিক-ইমরুলের প্রতিরোধে দলের রান পৌঁছায় ৬৬ রানে। মুশফিক (১৫) হাল ছেড়ে দিলেও ইমরুল ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। উইকেটের চারপাশে শট খেলে দ্রুত রান তোলেন এ বাঁহাতি। তাকে চতুর্থ উইকেটে সঙ্গ দেন মিথুন। মিডল অর্ডারে জায়গা পোক্ত করা মিথুন সাবলীলভাবেই নিজের খেলা খেলছিলেন।
দুজনের ৭১ রানের জুটিতে বাংলাদেশ বড় সংগ্রহের স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু হঠাৎ পথ হারায়। স্পিনারদের দাপটের সঙ্গে খেলা মিথুন ও ইমরুলকে ফেরাতে পেস আক্রমণ নিয়ে আসেন মাসাকাদজা। তাতেই পেয়ে যান সাফল্য। ১৪ বল ও ২ রানের ব্যবধানে বাংলাদেশ হারায় ৩ গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। ৩টি উইকেটই নেন জারভিস।
শুরুটা মিঠুনকে দিয়ে। ৪০ বলে ১ চার ও ৩ ছক্কায় ৩৭ রান করা মিথুন অযথা খোঁচা মারতে গিয়ে উইকেটের পিছনে ক্যাচ দেন। মাহমুদউল্লাহরও একই পরিণতি। ডানহাতি পেসারের বলে টেলরের হাতে ক্যাচ দেন। আম্পায়ারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে রিভিউ নিয়েছিলেন মাহমুদউল্লাহ। কিন্তু তাতেও বাঁচতে পারেননি। এরপর মেহেদী হাসান মিরাজ ১ রানে ক্যাচ দেন ওই টেলরের হাতেই।
দ্রুত ৩ উইকেট হারিয়ে খাদের কিনারায় ছিল বাংলাদেশ। সেখান থেকে ফিরে আসতে প্রয়োজন ছিল বিশাল এক জুটি। কাজের কাজটা করে দেন ইমরুল ও সাইফ উদ্দিন। সপ্তম উইকেটে তাদের রেকর্ড রানের জুটিতে স্বস্তি পায় বাংলাদেশ। এর আগে ২০১০ সালে ডানেডিনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১০১ রানের জুটি গড়েছিলেন মুশফিক ও নাঈম। আজ তাদের ছাড়িয়ে মিরপুরে নতুন রেকর্ড বুক ওপেন করলেন ইমরুল-সাইফউদ্দিন।
জুটির রেকর্ড গড়ার পথে ইমরুল তুলে নেন ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি। এর আগের তার দুই সেঞ্চুরির ম্যাচে জেতেনি বাংলাদেশ। আজ জেতায় সেঞ্চুরিটি তার কাছে বিশেষকিছু। রঙিন পোশাকে ১৩ ইনিংস পর সেঞ্চুরি পেলেন ইমরুল। অথচ প্রথম সেঞ্চুরির পর দ্বিতীয় সেঞ্চুরি পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ৪৯ ইনিংস! সেঞ্চুরির পর ঝড় তুলে ১৪৪ রানে আউট হন। যৌথভাবে যা বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান। সর্বোচ্চ ১৫৪ রান তামিম ইকবালের দখলে। ইমরুল ১৪০ বলে ১৩ চার ও ৬ ছক্কায় সাজান ইনিংসটি।
দলে ফেরা সাইফউদ্দিন বোলিংয়ের আগে ব্যাটিংয়ে দলের প্রয়োজন মেটান। প্রথম আন্তর্জাতিক হাফ সেঞ্চুরির স্বাদ পান বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। ৬৯ বলে ৩ চার ও ১ ছক্কায় করেন ৫০ রান। বল হাতে জিম্বাবুয়ের সেরা জারভিস। ৩৭ রানে নেন ৪ উইকেট।
লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতে ভয় দেখিয়েছিলেন মাসাকাদজা ও জোয়াহও। ৪৮ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েন তারা। অষ্টম ওভারে এ জুটি ভাঙেন মুস্তাফিজ। নিজের প্রথম ওভারের প্রথম বলে তুলে নেন জোয়াহওর উইকেট। উইকেটে আসা ব্রেন্ডন টেলরকে টিকতে দেননি নাজমুল। বাঁহাতি স্পিনার বোল্ড করেন টেলরকে।
এরপর হ্যামিলটন মাসাকাদজা রান আউট হন নিজের দোষে। ইমরুলের থ্রোতে অসাধারণ দক্ষতায় উইকেট ভাঙেন মুশফিক। সিকান্দার রাজাও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। নাজমুলের অসাধারণ ডেলিভারীতে বোল্ড হন ৭ রানে। দলীয় শতরানে ক্রেইগ আরভিনকে হারায় জিম্বাবুয়ে। মিরাজের বলে বোল্ড হন ১০ রানে মুশফিকের হাতে জীবন পাওয়া আরভিন। শতরান তুলতেই জিম্বাবুয়ের নেই ৫ উইকেট। স্কোরবোর্ডে ৬৯ রান যোগ হতে সাজঘরে আরও ৩ ব্যাটসম্যান।
লক্ষ্য তখন নাগালের বাইরে। জিম্বাবুয়ের রান যখন ৮ উইকেটে ১৬৯ তখন থেকেই জয় দেখছিল বাংলাদেশ। কিন্তু জয়ের আশা ছাড়েননি শন উইলিয়ামস ও জারভিস। দুজন নবম উইকেট ৬৭ রান যোগ করেন। যা শুধু পরাজয়ের ব্যবধান কমিয়েছে মাত্র। উইলিয়ামস ৫০ রানে অপরাজিত থাকেন। ২ রান করেন চাতারা।
বল হাতে মিরাজ ৩টি, নাজমুল নেন ২ উইকেট। ১টি করে উইকেট নেন মুস্তাফিজ ও মাহমুদউল্লাহ।
‘ছোট’ সিরিজে বাংলাদেশের সামনে ছিল ‘বড়’ চ্যালেঞ্জ। প্রথমত নিজেদের জয়ের ধারা অব্যাহত রাখা এবং দ্বিতীয়ত, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে না হারার চ্যালেঞ্জ। মাশরাফি আগের দিনই বলেছিলেন, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জিতলে সবাই বলবে স্বাভাবিক, হারলে ভিন্ন কথা হবে।’ তাইতো মাশরাফিরা ছিলেন সতর্ক। একাধিকবার ব্যাকফুটে চলে গেলেও বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে দারুণভাবে। অসাধারণ পারফরম্যান্সে উড়ছে লাল-সবুজের ঝান্ডা। দুরন্ত মাশরাফির দল।

No comments:
Post a Comment